| |

টাঙ্গাইল যেভাবে ময়মনসিংহ বিভাগের বাইরে চলে গেল

প্রকাশঃ জানুয়ারি ১২, ২০১৭ | ৫:০১ অপরাহ্ণ

মতিউর রহমান ফয়সাল:: প্রাচীন বঙ্গ জনপদের অর্ন্তগত আজকের ময়মনসিংহ একসময় ছিল এশিয়ার বৃহত্তম জেলা যা অবিভক্ত বাংলার সবচেয়ে বড় জেলা। বাংলাদেশে বর্তমানে বৃহত্তর ময়মনসিংহ বলতে বুঝানো হয় ময়মনসিংহ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, নেত্রকোণা ও শেরপুর ও কিশোরগঞ্জ জেলাকে নিয়ে গঠিত অঞ্চলকে।

যদিও বর্তমানে অনেক আন্দোলন ও সংগ্রামের পর পাওয়া ময়মনসিংহ বিভাগে সেচ্ছায় আসেনি ময়মনসিংহ জেলার এক সময়ের মহকুমা বর্তমান টাঙ্গাইল জেলা। যদিও ঐতিহাসিক ভাবে টাঙ্গাইল ময়মনসিংহের সাথে জড়িত।

টাঙাইল নাকি বৃহত্তর ময়মনসিংহের অংশ না! স্বার্থপরের মত ইতিহাস ভূলে যাওয়া নতুন কেউ কেউ এমন বলে থাকেন। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় চোখ ফেরালে দেখা যায় এটি মিথ্যা। ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের যোগসূত্রতা ও ময়মনসিংহ বিভাগের বাইরে কিভাবে চলে গেল টাঙ্গাইল জেলা শুধুমাত্র তা অনুসন্ধানের জন্য এই লেখা।

বলা হতো, ‘বাঘ সিংহ মহিশের শিং এই তিনে ময়মনসিংহ। কারণ অনেক অনেক আগে মধুপুরের জংগলে ছিল বাঘ-সিংহের ডেরা এবং নদের এ পাড়ে মহিশের নিরাপদ আবাস।

প্রাচীন পাল, মুগল ও সুলতানী আমলে টাঙ্গাইল নামের কোন স্থানের চিহ্ন পাওয়া যায় না। ১৭৮৮ সালে ইংরেজ সরকার সর্বপ্রথম সমগ্র দেশের ভূমিজরিপ শুরু করেছিলেন। এতে কাগমারী ও আটিয়া পরগনার কথা আলাদা আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছিলো। তবে সেই খানেও টাঙ্গাইলের উল্লেখ ছিলো না। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, প্রাচীন যুগে টাঙ্গাইল ছিল আসাম-কামরূপ রাজ্যের অংশ।

সেন বংশের রাজা নৃপতি সেনের আমলে টাঙ্গাইল সেনদের অধীনে আসে। এখানে মুসলমান রাজ্যের সূচনা হয় চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম দিকে। এবার ময়মনসিংহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ হওয়ার আগে ফিরে যাই চলুন, ১১৬০-১১৭৮ খ্রীঃ বাংলাদেশের রাজা বল্লাল সেন তার রাজ্য পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করেন, রাঢ়, বাগড়ী, মিথিলা, বারেন্দ্র ও বঙ্গ নাম ছিল তখন যেখানে বঙ্গের অংশ ছিল করতোয়া ও ব্রম্মপুত্রের মধ্যবর্তী স্থান। বলা হত, ভাটি হইতে আইলো বঙ্গাল লম্বা লম্বা দাড়ি। এই ভাটি বলতে বুঝান হত ময়মনসিংহ জেলার পূর্ব প্রান্তস্থ  অঞ্চল সমূহকে। মধ্যযুগে এখানে সর্দার শাসিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশীয় রাজ্য ছিল। শাহসুজার সময় এটিকে বঙ্গালভূমি বলা হতো, বহ্মপুত্রের পশ্চিম তট ময়মনসিংহ, ঢাকা ও ফরিদপুরের অংশ বিশেষ আদি বঙ্গের এলাকা যা বাংলার প্রাচীন রাজধানী নামে ঢাকার কাছে অবস্থিত ছিল।

এভাবে কালের পরিক্রমায়, মোগল শাসন, শাহি শাসন এর পর নসরত শাহের সময় মোগলশাহীর রাজস্বমন্ত্রী টোভরমলের ওয়াশীল জমা বন্দোবস্তে ১৫৮২ সালে বঙ্গ দেশকে ১৯ টি সরকারে ও ৬৮২টি মহালে ভাগ করা হয় যার মধ্যে একটি ছিল মমিনশাহী।

তবে এ অঞ্চলের নামের বিবর্তন মমিসশাহী, মোমেনশাহী, নাসিরাবাদ,আলাপসিং, মোমনসিং, ময়মনসিংহ প্রচলিত হয়। ইংরেজদের শাসন প্রতিষ্ঠা ও শাসনে স্থিতিশীলতার কারণে ১৭৮৭ সালের ১লা মে ময়মনসিংহ জেলা স্থাপিত হয়। এর আগে এই নামে শুধুমাত্র একটি পরগণার অস্থিত্ব পাওয়া যায়। তবে জেলা প্রতিষ্ঠার সময় এর আয়তন ছিল সিলেট, ত্রিপুরা, সিরাজগঞ্জ, নৌয়াখালি জেলার ভুলুয়া, আসামের তূরা প্রভৃতি বহু দূরবর্তী স্থানে যেখানে ময়মনসিংহের কালেক্টরের পক্ষে শাসন করা সম্ভব ছিল না এবং বিভিন্ন বিদ্রোহ দমন ও শাসন সুশৃঙ্খল করার জন্য জেলায় তরান্বিত হয় এটি।

এখানে এসে টাঙাইল মহকুমার কথা শোনা যায়, ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত রেনেল তাঁর মানচিত্রে এ সম্পূর্ণ অঞ্চলকেই ‘আটিয়া’ বলে দেখিয়েছেন। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দের আগে টাঙ্গাইল নামে কোনো স্বতন্ত্র স্থানের পরিচয় পাওয়া যায় না।

১৫ নভেম্বর ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে মহকুমা সদর দপ্তর আটিয়া থেকে টাঙ্গাইলে স্থানান্তরের সময় থেকে। যা ছিল ময়মনসিংহ জেলার অংশ। টাঙ্গাইলের ইতিহাস প্রণেতা খন্দকার আব্দুর রহিম সাহেবের মতে, ইংরেজ আমলে এদেশের লোকেরা উচু শব্দের পরিবর্তে ‘টান’শব্দই ব্যবহার করতে অভ্যস্ত ছিল বেশি। এখনো টাঙ্গাইল অঞ্চলে ‘টান’শব্দের প্রচলন আছে। এই টানের সাথে আইল শব্দটি যুক্ত হয়ে হয়েছিল টান আইল। আর সেই টান আইলটি রূপান্তরিত হয়েছে টাঙ্গাইলে।তবে নামকরণের আরও অনেক কাহিনী স্থানীয় ভাবে প্রচলিত রয়েছে।

ময়মনসিংহের অদূরে আটিয়া পরগণা বর্তমানের টাঙাইল অঞ্চল বলে খ্যাত। ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার বলেন, সম্ভবত শামসুদ্দিন ফিরোজের (দেহলভী) রাজত্ব কালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে বর্তমান কালের ময়মনসিংহ জেলার মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা। এতে প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমান টাঙ্গাইল জেলা যা পূর্বে ময়মনসিংহ জেলার অংশ বিশেষ ছিল সেখানে মুসলমান রাজত্বের সূচনা হয় চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথমদিকে।

শিক্ষা বিস্তারের জন্য ময়মনসিংহের পর ১৮৭০ খ্রীঃ টাঙাইল শহর সংলগ্ন সন্তোষ গ্রামে জান্হবি স্কুল স্থাপিত হয়। কাগমারী ও আটিয়া পরগণা অঞ্চলটি ময়মনসিংহ জেলার শাসনাধীনের ছিল।

১৮৪৫ সালে ময়মনসিংহ জেলা প্রতিষ্ঠার ৫৮ বছর পর ব্রিট্রিশরা শাসন কাজ দুই ভাগে ভাগ করেন যার একটি ময়মনসিংহ মহকুমা ও জামালপুর মহকুমা। এখানে এসে বর্তমান টাঙাইলের তৎকালিন আটিয়ার কিছু অংশ ঢাকা জেলার সাথে মিশে কিন্তু বেশির ভাগ ময়মনসিংহ ও জামালপুর মহকুমায় থেকে যায়। পরবর্তীতে সমগ্র জেলা ৫টি মহকুমায় বিন্যস্ত হয় যথা- ময়মনসিংহ, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙাইল ও নেত্রকোণা।

৩ মে ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে আটিয়া, পিংনা ও মধুপুর থানা সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় আটিয়া মহকুমা। ১৫ নভেম্বর ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে আটিয়া থেকে টাঙ্গাইলে মহকুমা সদর দপ্তর স্থানান্তর করা হয়। তখন মহকুমায় টাঙ্গাইল, কালিহাতী ও গোপালপুর এই তিনটি থানা এবং নাগরপুর, মির্জাপুর, ঘাটাইল ও জগন্নাথগঞ্জ- এই চারটি ফাঁড়ি থানা ছিল। মধুপুর থানা তখন ময়মনসিংহ সদর মহকুমার সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরে জগন্নাথগঞ্জ ফাঁড়ি থানাকে পাবনা এবং মধুপুর থানাকে টাঙ্গাইলের অন্তর্ভূক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে টাঙাইল মহকুমা জেলায় পরিণত হয় খন্দকার আবদুর রহিম টাঙ্গাইলের ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন; ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলা স্থাপিত হয়েছিল। বর্তমানে টাঙ্গাইল যে মোমেনশাহী জেলার অন্তর্গত ছিল।

১৯১৫ সালের দিকে ময়মনসিংহ জেলাকে ভেঙে ছোট ছোট জেলায় পরিণত করার কথা উল্লেখ্য করেন ইংরেজরা তাদের প্রশাসনিক কাজ ঠিক মত পরিচালনার জন্য। অবিভক্ত বঙ্গদেশে ময়মনসিংহ জেলা ছিল সবচেয়ে বড় জেলা। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১ডিসেম্বর টাঙ্গাইল মহকুমা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৯তম জেলা হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে। এভাবেই ময়মনসিংহ জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় টাঙাইল মহকুমা।

কালের পরিক্রমায় দুই জেলার মধ্যে বাড়ে দুরত্ব ও সাংস্কৃতিক বৈরিতা, যদিও ঢাকার উপ বিভাগ বলা হত এই অঞ্চলকে যা বৃহত্তর ময়মনসিংহ নামে পরিচিত দেশে। বিভাগ বাস্তবায়নে এই জনপদের মানুষ ৮০-৯০ এর দশকে আন্দোলন জোড়ে করলেও রাজনৈতিক কারণে এটির বাস্তবায়ন হয় নি তখন। বৃহত্তর ময়মনসিংহের জেলাগুলোর আঞ্চলিক শিক্ষা বিভাগ ময়মনসিংহে।

১৯৮৯ সনে প্রতিষ্ঠিত ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলন ময়মনসিংহ বিভাগ বাস্তবায়ন আন্দোলন করে আসছিল পাশ্ববর্তী জেলাগুলোকে নিয়ে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ঢাকা বিভাগ ভেঙ্গে নতুন ময়মনসিংহ বিভাগ গঠনের ঘোষণা দেন। শুরুতে ঢাকা বিভাগের উত্তর অংশ থেকে প্রতিবেশী ৮টি জেলা নিয়ে পরে ৬টি জেলা নিয়ে ময়মনসিংহ বিভাগ গঠনের পরিকল্পনা করা হয়। এসময় টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জবাসী, ময়মনসিংহ বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হতে অনীহা ও বিরোধীতা করে এবং ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত থাকতেই ইচ্ছাপোষণ করে।

ঢাকাস্থ টাঙ্গাইল নাগরিক কমিটি সংবাদ সম্মেলন করে এই প্রশাসনিক বিকেন্দ্রিকরণ চায় না বলে জানায় এবং ঢাকা বিভাগের অংশ হয়ে থাকার ইচ্ছাপোষণ করে আন্দোলন করে। টাঙ্গাইলের ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা বিবেচনা করে ঢাকা বিভাগ থেকে বিচ্ছিন্ন না করার জোর দাবি জানান তারা। অথচ টাঙ্গাইলের ইতিহাস ঐতিহ্য যুক্ত ময়মনসিংহের সাথে তা তারা ভুলে যান। ঢাকার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও দুরত্ব কম থাকার কারনে ময়মনসিংহ বিভাগে যুক্ত না হতে আন্দোলন করেন টাঙ্গাইল জেলা পরিষদের প্রশাসক ফজলুর রহমান খান ফারুকের নেতৃত্বে সকল রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদসহ সবাই সর্বাত্বকভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে থেকে একাত্বতা প্রকাশ করা এবং বিভিন্ন কর্মসূচীও পালন করেন।

প্রতিবাদে টাঙ্গাইলের মানুষ মানববন্ধন, ১০ লাখ লোকের স্বাক্ষর সংবলিত স্মারকলিপি, ১০ মিনিট স্তব্ধ টাঙ্গাইল ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করেছে। কারণ হিসেবে তারা উল্ল্যেখ্ করেন যে, ব্যবহারিক দিক থেকে টাঙ্গাইলের জন্য ঢাকা সামনে, ময়মনসিংহ পেছনে। টাঙ্গাইলের ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ সব যোগাযোগ ঢাকার সঙ্গে। এখন বিভাগীয় সদর ময়মনসিংহ হলে টাঙ্গাইলবাসীকে পশ্চাতে ঠেলে দেওয়া হবে। টাঙ্গাইল সদর থেকে ঢাকার চেয়ে ময়মনসিংহ সদরের দূরত্বই বেশি।

অন্যদিকে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর, ধনবাড়ী ও গোপালপুর উপজেলাসহ অন্যান্য এলাকা ময়মনসিংহ বিভাগে থাকার জন্য আন্দোলন করতে থাকেন স্থানীয় নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। অবশেষে ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ জেলাকে বাদ দিয়ে ৪টি জেলা নিয়ে ময়মনসিংহ বিভাগ গঠিত হয়। যার মাধ্যমে ময়মনসিংহ বিভাগ ও টাঙ্গাইলের নাগরিকদের মধ্যে একটি মনস্থাত্তিক দূরত্ব তৈরি হয়। ইতিহাসের স্বার্থপরতা বা নাগরিকদের সুযোগ সুবিধার তারতম্য অথবা শুধুই মানসিক দৈন্যতার প্রকাশ যাই হোক না কেন এভাবেই বৃহত্তর ময়মনসিংহের মহকুমা ও ঐতিহাসিক ভাবে সর্ম্পকিত টাঙ্গাইল জেলা ময়মনসিংহ বিভাগের বাইরে চলে যায়।

খুবই সংক্ষেপে ইতিহাস আলোচনা করা হয়েছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি যতটুকু সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তা নয়। ইতিহাস জানুন, ময়মনসিংহকে জানুন।

 

তথ্য সূত্র:

১. ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন-দরজি আবদুল ওয়াহাব

২. http://www.tangail.gov.bd/node/316630-টাঙাইল জেলা তথ্যবাতায়ন

৩. ময়মনসিংহের ইতিহাস-কেদারনাথ মজুমদার

৪. বাঙলা ও বাঙালী- অজয় রায়

৫. টাঙ্গাইলের ইতিহাস-খন্দকার আব্দুর রহিম

 

লেখক: মতিউর রহমান ফয়সাল
কলাম লেখক ও আইনজীবী,
ময়মনসিংহ জেলা জজ কোর্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *